Quick কুইজ প্রতিযোগিতা Quick কুইজ প্রতিযোগিতা Quick কুইজ প্রতিযোগিতা আজকেই অংশগ্রহণ এবং মূল্যবান পুরস্কার অর্জন করুন। নূন্যতম প্রাইজ ( 100 SR ) 100 সৌদি রিয়াল ।     সম্মানিত দর্শক, শ্রতা ও পাঠকগণ, আপনারাদের সুবিধার জন্য ওয়েব সাইটের মূল প্যাজে ভিডিও অপশান বাড়ানো হলো। এখন খেকে আপনারা শতাধিক ভিডিও থেকে প্রয়োজন অনুসারে নিজ পছন্নমত বিষয় নির্বাচন করে দেখতে পারবেন।     সম্মানিত দর্শক ও শ্রতাগণ, আপনাদেরকে সবিনয় অনুরোধ করা যাছে যে, আপনারা আপনাদের যে কোন গঠনমূলক সমালোচনা ও সুপরামর্শ জানিয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে ভুলবেন না। আপনাদের সুপরামর্শের জন্য আপনাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ।    
  • দর্শক কাউন্টার

    Flag Counter

     


    আশুরা রোজার ফজিলত فضل صيام عاشوراء





                                                                                                                                     আশুরার সাওমের ফযীলত

    আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,  

    «مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلّا هَذَا الْيَوْمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، وَهَذَا الشَّهْرَ يَعْنِي شَهْرَ رَمَضَانَ»

    “আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাওম রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখি নি, যত দেখেছি এ ‘আশুরার দিন এবং এ মাস অর্থাৎ রমযান মাসের সাওমের প্রতি”।[1]

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «صيام يوم عاشوراء، إني أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله»

    “আশুরার দিনের সাওমের ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি,তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের পাপ ক্ষমা করে দিবেন”।[2]

    এটি আমাদের প্রতি মহান আল্লাহর অপার করুণা। তিনি একটি মাত্র দিনের সাওমর মাধ্যমে পূর্ণ এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সত্যই মহান আল্লাহ পরম দাতা।

    বছরের কোন দিনটি আশুরার দিন

    আল্লামা নাওয়াবী রহ. বলেন, তাসু‘আ, আশুরা দু’টি মদ্দযুক্ত নাম। অভিধানের গ্রন্থাবলীতে এটিই প্রসিদ্ধ। আমাদের সাথীরা বলেছেন, আশুরা হচ্ছে মুহররম মাসের দশম দিন। আর তাসু‘আ সে মাসের নবম দিন। জমহুর ওলামারাও তা-ই বলেছেন। হাদীসের আপাতরূপ ও শব্দের প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক চাহিদাও তা-ই। ভাষাবিদদের নিকট এটিই প্রসিদ্ধ।[3]

    এটি একটি ইসলামী নাম,  জাহেলি যুগে পরিচিত ছিল না।[4]

    ইবন কুদামাহ রহ. বলেন, ‘আশুরা মুহররম মাসের দশম দিন। এটি সা‘ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ও হাসান বসরি রহ.-এর মত। কারণ, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহুমা আনহুমা বর্ণনা করেন,  

    «أمر رسول الله  صلى الله عليه وسلم - بصوم يوم عاشوراء العاشر من المحرم ».

    “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরা-মুহররমের দশম দিনে সাওম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন”।[5]

    ‘আশুরার সাথে তাসু‘আর সাওমও মুস্তাহাব

    আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন,  

    «حِينَ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ". قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ».

    “যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার সাওম রাখলেন এবং (অন্যদেরকে) সাওম রাখার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা বলল,  হে আল্লাহর রাসূল! এটিতো এমন দিন, যাকে ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানরা বড় জ্ঞান করে,সম্মান জানায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,আগামী বছর এদিন আসলে  আমরা নবম দিনও সাওম রাখব ইনশাআল্লাহ। বর্ণনাকারী বলছেন,আগামী বছর আসার পূর্বেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়ে গিয়েছে”[6]

    ইমাম শাফে‘ঈ ও তার সাথীবৃন্দ,  ইমাম আহমাদ,  ইমাম ইসহাক প্রমুখ বলেছেন,  আশুরার সাওমের ক্ষেত্রে দশম ও নবম উভয় দিনের সাওম-ই মুস্তাহাব। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ তারিখ সাওম রেখেছেন এবং নয় তারিখ সাওম রাখার নিয়ত করেছেন।

    এর-ই ওপর ভিত্তি করে বলা যায়,আশুরার সাওমের কয়েকটি স্তর রয়েছে: সর্ব নিম্ন হচ্ছে কেবল দশ তারিখের সাওম রাখা। এরচে উচ্চ পর্যায় হচ্ছে তার সাথে নয় তারিখের সাওম পালন করাএমনিভাবে মুহররম মাসে সাওমের সংখ্যা যত বেশি হবে মর্যাদা ও ফযীলতও ততই বাড়তে থাকবে।

    তাসু‘আর সাওম মুস্তাহাব হবার হিকমত

    ইমাম নাওয়াবী রহ. বলেন,  তাসু‘আ তথা মুহররমের নয় তারিখ সাওম মুস্তাহাব হবার হিকমত ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে প্রাজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন,  

    এক. এর উদ্দেশ্য হলো,ইয়াহূদীদের বিরোধিতা করা। কারণ তারা কেবল একটি অর্থাৎ দশ তারিখ সাওম রাখত।

    দুই. আশুরার দিনে কেবলমাত্র একটি সাওম পালনের অবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে তার সাথে অন্য একটি সাওমের মাধ্যমে সংযোগ সৃষ্টি করা। যেমনিকরে এককভাবে জুমু‘আর দিন সাওম রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। এটি আল্লামা খাত্তাবী ও অন্যান্যদের মত।

    তিন. দশ তারিখের সাওমের ক্ষেত্রে চন্দ্র গণনায় ত্রুটি হয়ে ভুলে পতিত হবার আশংকা থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে। হতে পারে গণনায় নয় তারিখ কিন্তু বাস্তবে তা দশ তারিখ।

    এর মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী তাৎপর্য হচ্ছে,আহলে কিতাবের বিরোধিতা করা। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেছেন,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু হাদীসে আহলে কিতাবদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, আশুরা প্রসঙ্গে বলেছেন, لَئِنْ عِشْتُ إلَى قَابِلٍ لاَصُومَنَّ التَّاسِعَআমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই নয় তারিখ সাওম রাখব”[7]

    আল্লামা ইবন হাজার রহ. لئن بقيت إلى قابل لأصومن التاسع  আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই নয় তারিখ সাওম রাখব।”

    হাদীসের ব্যাখ্যা-টিকায় বলেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয় তারিখে সাওম রাখার সংকল্প ব্যক্ত করার উদ্দেশ্য কিন্তু এই নয় যে,  তিনি কেবল নয় তারিখে সাওম রাখার সংকল্প করেছেন বরং তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে, দশ তারিখের সাওমের সাথে নয় তারিখের সাওমকে সংযুক্ত করা। সাবধানতা বশতঃ কিংবা ইয়াহূদী খ্রিষ্টানদের বিরোধিতার জন্য। এটিই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত মত। সহীহ মুসলিমের কতিপয় বর্ণনা এদিকেই ইঙ্গিত করে।[8]

    শুধু দশ তারিখ সাওম রাখার বিধান

    শাইখুল ইসলাম বলেন, আশুরার সাওম এক বছরের গুনাহের কাফ্ফারা আর আশুরার একটিমাত্র সাওম মাকরূহ হবে না।[9]

    ইবন হাজার হায়সামী রচিত তুহফাতুল মুহতাজ গ্রন্থে আছে, আশুরা উপলক্ষে দশ তারিখ কেবল একটি সাওম রাখাতে কোনো দোষ নেই।[10]

    নির্ধারিত দিনটি শনি কিংবা জুমু‘আ বার হলেও আশুরার সাওম রাখা হবে

    কেবলমাত্র জুমু‘আর দিনকে নফল সাওমর জন্য নির্ধারণ করা মাকরূহ, অনুরূপভাবে ফরয সাওম ব্যতীত শনিবার সাওম রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে নিম্নের যে কোনো পদ্ধতির অনুকূলে রাখা হলে আর মাকরূহ হবে না। যেমন, ঐ দুই দিনের সাথে মিলিয়ে আরো একদিন করে  সাওম রাখা। দিনটি অনুমোদিত অভ্যাসের অনুকূলে পড়ে যাওয়া যেমন একদিন সাওম রাখা একদিন ইফতার করা। মান্নত কিংবা ক্বাযার সাওম হওয়া। অথবা শরী‘আত সাওম রাখতে উৎসাহিত করেছে এমন তারিখে ঐ দিনদ্বয় পড়ে যাওয়া, যেমন আরাফা কিংবা আশুরার দিন...।[11]

    আল্লামা বাহুতি রহ. বলেন, শুধুমাত্র শনিবারকে সাওম রাখার জন্য নির্ধারণ করা মাকরূহ। কারণ, এ প্রসঙ্গে হাদীসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

    «لا تَصُومُوا يَوْمَ السَّبْتِ إلّا فِيمَا اُفْتُرِضَ عَلَيْكُمْ»

    “ফরয সাওম ব্যতীত তোমরা কেবল শনিবার সাওম রাখবে না”[12]

    তাছাড়া শনিবারকে ইয়াহূদীরা খুব সম্মান করে, অনেক বড় করে দেখে, তাই সেদিন সাওম রাখলে তাদের তাশাব্বুহ তথা সাদৃশ্যাবলম্বন হয়ে যাবে...। তবে শুক্র বা শনিবার যদি কোনো ব্যক্তির অনুস্মৃত অভ্যাসের আওতায় পড়ে যায় তাহলে আর মাকরূহ হবে না। যেমন, এক ব্যক্তি নিয়মিত আরাফা ও আশুরার সাওম পালন করে আর সেই আরাফা কিংবা আশুরার দিন শনি কিংবা শুক্রবার দিন সংঘটিত হল তাহলে সে ব্যক্তির জন্য উক্ত শুক্র কিংবা শনিবার সাওম রাখা মাকরূহ হবে না। কেননা এসব ক্ষেত্রে অভ্যাসকে বিবেচনায় রাখা হয়...।[13]

    মাসের শুরু অস্পষ্ট হয়ে গেলে করণীয় কি?

    ইমাম আহমদ রহ. বলেন, মাসের শুরু নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে কিংবা সেটি অস্পষ্ট হয়ে গেলে সে মাসে আশুরার সাওম তিনদিন রাখা হবে। আর এমনটি করা হবে কেবল নয় ও দশ তারিখের সাওমকে নিশ্চিত করার জন্য।[14]

    সুতরাং যে ব্যক্তি মুহররম মাসের আগমণ সম্বন্ধে বুঝতে পারে নি এবং সে দশ তারিখের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে ইচ্ছুক তাহলে সে নিয়মমত যিলহজকে ত্রিশ দিন গণনা করবে। অতঃপর নয় ও দশ তারিখ সাওম রাখবে। আর যে ব্যক্তি নয় তারিখের ব্যাপারেও সাবধানতা অবলম্বন করতে চাইবে সে আট, নয় ও দশ তারিখ মোট তিন দিন সাওম রাখবে। (এখন যদি যিলহজ মাস নাকেস অর্থাৎ ত্রিশ দিন থেকে কম হয় তাহলে সে নিশ্চিত তাসু‘আ ও আশুরার সাওম রাখতে সক্ষম হবে) তবে এখানে মনে রাখা দরকার, আশুরার সাওম কিন্তু মুস্তাহাব, ফরয নয়। তাই লোকদেরকে রমযান ও শাওয়াল মাসের মত মুহররম মাসের চাঁদ তালাশ করার নির্দেশ দেওয়া হবে না।

    আশুরার সাওম কোন ধরনের পাপের জন্য কাফ্ফারা?

    ইমাম নাওয়াবী রহ. বলেন, আশুরার সাওম সকল সগীরা গুনাহের কাফ্ফারা। অর্থাৎ এ সাওমের কারণে মহান আল্লাহ কবীরা নয় বরং (পূর্ববর্তী একবছরের) যাবতীয় সগীরা গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।

    এর পর তিনি বলেন, আরাফার সাওম দুই বছরের (গুনাহের জন্য) কাফ্ফারা, আশুরার সাওম এক বছরের জন্য কাফ্ফারা, যার আমীন ফিরিশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে... হাদীসে বর্ণিত এসব গুনাহ মাফের অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তির আমলনামায় যদি সগিরা গুনাহ থেকে থাকে তাহলে এসব আমল তার গুনাহের কাফ্ফারা হবে অর্থাৎ আল্লাহ তার সগীরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। আর যদি সগীরা-কবীরা কোনো গুনাহই না থাকে তাহলে এসব আমলের কারণে তাকে সাওয়াব দান করা হবে, তার দরজাত বুলন্দ করা হবে। আর আমলনামায় যদি শুধু কবীরা গুনাহ থাকে সগীরা নয় তাহলে আমরা আশা করতে পারি,  এসব আমলের কারণে তার কবীরা গুনাহসমূহ হালকা করা হবে।[15]

    শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, পবিত্রতা অর্জন, সালাত, রমযান, আরাফা ও আশুরার সাওম ইত্যাদি কেবল সগীরা গুনাহসমূহের কাফ্ফারা অর্থাৎ এসব আমলের কারণে কেবল সগীরা গুনাহ ক্ষমা করা হয়।[16]

    রোজার সাওয়াব দেখে প্রতারিত হওয়া চলবে না

    ‘আরাফা কিংবা ‘আশুরার সাওমের ওপর নির্ভর করে অনেক বিভ্রান্ত লোক ধোঁকায় পড়ে যায়। আত্মপ্রতারিত হয়। এমনকি অনেককে বলতে শোনা যায়, আশুরার সাওমর কারণে পূর্ণ এক বছরের পাপ ক্ষমা হয়ে গিয়েছে। বাকি থাকল ‘আরাফার সাওম, তো সেটি সাওয়াবের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে।

    আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, এ আত্ম প্রবঞ্চিত-বিভ্রান্ত লোকটি বুঝল না যে,  রমযানের সাওম ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ‘আরাফা ও ‘আশুরার সাওমর চেয়ে বহু গুণে বড় ও অধিক সাওয়াবযোগ্য ইবাদত। আর এগুলো মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের জন্য কাফ্ফারা তখনই হয় যদি কবীরা গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকা হয়। সুতরাং এক রমযান থেকে পরবর্তী রমযান এবং এক জুমু‘আ থেকে পরবর্তী জুমু‘আ, মধ্যবর্তী সময়ে কৃত পাপের জন্য কাফ্ফারা তখনই হবে যখন কবিরা গুনাহ ত্যাগ করা হবে। উভয়বিধ কার্য সম্পাদনের মাধ্যমেই কেবল সগীরা গুনাহ মাফ হবে।

    আবার কিছু বিভ্রান্ত লোক আছে, যারা ধারণা করে, তাদের নেক আমল বদ আমল থেকে বেশি। কারণ, তারা গুনাহের ভিত্তিতে নিজেদের হিসাব নেয় না এবং পাপাচার গণনায় আনে না। যদি কখনো কোনো নেক আমল সম্পাদন করে তখন কেবল তাই সংরক্ষণ করে। এরা সেসব লোকদের ন্যায় যারা মুখে মুখে ইস্তেগফার করে অথবা দিনে একশত বার তাসবিহ পাঠ করে অতঃপর মুসলিমদের গীবত ও সম্মান বিনষ্টের কাজে লেগে যায়। সারা দিন আল্লাহর অসন্তুষ্টিমূলক কাজে অতিবাহিত করে। এসব লোক তাসবীহ তাহলীলের ফযীলত সম্বন্ধে খুব ফিকির করে। কিন্তু তার মাধ্যমে সংঘটিত অন্যায় ও পাপকর্মের প্রতি মোটেই দৃষ্টিপাত করে না। এটিতো কেবলই ধোঁকা ও আত্মপ্রতারণা।[17]

    রমযানের ক্বাযা অনাদায়ি থাকা অবস্থায় আশুরার সাওমের হুকুম কী?

    রমযানের ক্বাযা আদায় না করে নফল সাওম রাখা যাবে কিনা এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ আছে। হানাফীদের নিকট জায়েয। কেননা রমযানের ক্বাযা সম্পন্ন করা তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াজিব নয়। বিলম্বে সম্পন্ন করার অবকাশ আছে। শাফে‘ঈ ও মালেকিদের নিকটও জায়েয তবে মাকরূহ হবে। কারণ, এতে ওয়াজিব আদায় বিলম্বিত হয়।

    আল্লামা দুসূকি রহ. বলেন, মান্নত, ক্বাযা ও কাফ্ফারা জাতীয় ওয়াজিব সাওম অনাদায়ি রেখে নফল সাওম পালন করা মাকরূহ। সে নফল সাওমটি গাইরে মুআক্কাদাহ হোক কিংবা মুআক্কাদাহ যেমন আশুরা, যিলহজের নয় তারিখের সাওম ইত্যাদি।

    হাম্বলী ইমামগণের মতে রমযানের ক্বাযা আদায় করার পূর্বে নফল সাওম পালন করা হারাম। এমতাবস্থায় কেউ নফল সাওম রাখলে সহীহ হবে না এমনকি পরবর্তীতে ক্বাযা আদায় করার মত পর্যাপ্ত সময় থাকলেও বরং আগে ফরয আদায় করতে হবে।[18]

    সুতরাং প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে, রমযানের পরপরই বিলম্ব না করে ক্বাযা সম্পন্ন করে নেওয়া। যাতে কোনোরূপ সমস্যা ছাড়াই আরাফা ও আশুরার সাওম পালনের সুযোগ পাওয়া যায়। কেউ যদি আরাফা ও আশুরার সাওমের ক্বাযা আদায়ের নিয়ত করে এবং এ নিয়ত রাত্র হতেই করে তাহলে সেটি তার জন্য যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ তার ক্বাযা আদায় হয়ে যাবে। আল্লাহর করুণা অনেক বিশাল।

    ‘আশুরায় উদযাপিত কিছু বিদ‘আত

    ‘আশুরার দিন লোকেরা সুরমা লাগানো, গোসল করা, মেহেদি লাগানো, মুসাফাহা করা, খিচুড়ি রান্না করা,  আনন্দ উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করে থাকে এ সম্বন্ধে শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. কে প্রশ্ন করা হলো, এর কোনো ভিত্তি আছে কি না?

    জবাবে তিনি বললেন, এসব অনুষ্ঠানাদি উদযাপন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ কোনো হাদীস বর্ণিত হয় নি এবং সাহাবীগণ থেকেও না। চার ইমামসহ নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমও এসব কাজকে সমর্থন করেন নি। কোনো মুহাদ্দিস এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণ থেকে কোনো সহীহ কিংবা দুর্বল হাদীসও বর্ণনা করেন নি। তাবে‘ঈদের থেকেও কোনো আছর পাওয়া যায় নি। পরবর্তী যুগে কেউ কেউ কিছু বানোয়াট ও জাল হাদীস বর্ণনা করেছে যেমন, “যে ব্যক্তি আশুরার দিন সুরমা লাগাবে সে ব্যক্তি সে বছর থেকে চক্ষুপ্রদাহ রোগে আক্রান্ত হবে না।” “যে ব্যক্তি আশুরার দিন গোসল করবে সে সেই বছর থেকে আর রোগাক্রান্ত হবে না।” এরূপ অনেক হাদীস। এরই ধারাবাহিকতায় তারা একটি মওদু‘ হাদীস বর্ণনা করেছে। যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালল্লামের প্রতি মিথ্যারোপ ব্যতীত আর কিছুই নয়। হাদীসটি হচ্ছে,  

    «أَنَّهُ مَنْ وَسَّعَ عَلَى أَهْلِهِ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَسَّعَ اللَّهُ عَلَيْهِ سَائِرَ السَّنَةِ»

    “যে ব্যক্তি আশুরার দিন নিজ পরিবারের ওপর উদার হাতে খরচ করবে আল্লাহ তা‘আলা সারা বছরের জন্য তাকে সচ্ছলতা দান করবেন।” এ ধরণের সবগুলো বর্ণনা মিথ্যা ও জাল।

    অতঃপর শাইখ উল্লেখ করেছেন, যার সার সংক্ষেপ হচ্ছে- এ উম্মতের অগ্রজদের ওপর যখন সর্বপ্রথম ফিতনা আপতিত হলো ও হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত সঙ্ঘটিত হলো। এর কারণে বিভিন্ন দলের লোকেরা কী করল? তিনি বলেন,

    তারা যালেম ও জাহেলদের দলে রাপান্তরিত হলো। হয়ত মুনাফিক বে-দীন নয়ত বিভ্রান্ত বিপথগামী। তারা বন্ধুত্ব ও আহলে বাইতের বন্ধুত্ব প্রকাশ করতে লাগল। আশুরার দিনকে রোলবিল, কান্নাকাটি ও শোক দিবস হিসাবে গ্রহণ করল। তাতে তারা বুক ও চেহারা চাপড়ানো, আস্তিন ছেড়াসহ জাহেলি যুগের বিভিন্ন প্রথা প্রকাশ করতে লাগল। বিভিন্ন শোকগাথা যার অধিকাংশই বানোয়াট ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ ও গীত আবৃত্তি করতে লাগল। এর ভেতর সত্যের কিছুই নেই আছে শুধু স্বজনপ্রীতি ও মনোকষ্টের নবায়ন। মুসলিমদের পরস্পরে যুদ্ধ ও দুশমনি সৃষ্টির পায়তারা। পূর্ববর্তী পূন্যাত্মা সাহাবীগণকে গালমন্দ করার উপাদান। মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের অনিষ্ট ও ক্ষতির পরিসংখ্যান কেউ লিখে শেষ করতে পারবে না। তাদের মোকাবেলা করেছে হয়ত আহলে বাইত ও হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত নাসেবি সম্প্রদায় অথবা একদল জাহেল সম্প্রদায়। যারা ফাসেদের মোকাবেলা করেছে ফাসেদ দিয়ে। মিথ্যার মোকাবেলা মিথ্যার মাধ্যমে, খারাপের জবাব দিয়েছে খারাপ দিয়ে এবং বিদ‘আতের জবাব দিয়েছে বিদ‘আতের মাধ্যমে।

    ইবনুল হা-জ্জ রহ. বলেন, আশুরার বিদ‘আতের আরো একটি হচ্ছে, তাতে যাকাত আদায় করা। বিলম্বিত কিংবা অগ্রীম। মুরগি জবাইর জন্য একে নির্ধারণ করা। নারীদের মেহেদি ব্যবহার করা।[19]

    আল্লাহ তা‘আলা আশুরাসহ যাবতীয় কর্মে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহর আদর্শের পূর্ণ অনুবর্তনের তাওফীক দান করুন। আমিন।

    সমাপ্ত



    [1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৬৭

    [2] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৭৬

    [3] আল-মজমূ

    [4] কাশ্শাফুল কান্না ২য় খণ্ড, সওমুল মুহররম

    [5] তিরমিযী, তিনি বলেছেন, হাদীসটি হাসান সহীহ

    [6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯১৪৬

    [7] আল-ফতোয়াল কোবরা, খণ্ড ৬

    [8] ফাতহুল বারি: ৪/২৪৫

    [9] আল-ফাতাওয়াল কুবরা: ৫ম খণ্ড

    [10]  ৩য় খণ্ড, বাবু সওমিত তাতাব্বু‘

    [11] তুহফাতুল মুহতাজ, ৩য় খণ্ড, বাবু সওমিত তাতাব্বু’,  মুশকিলুল আছার, ২য় খন্ড, বাবু সওমি য়াওমিস সাবতি

    [12] আহমাদ ও হাকেম

    [13] কাশ্শাফুল কান্না’,  ২য় খণ্ড, বাবু সওমিত তাতাব্বু’

    [14] আল-মুগনি লি ইবন কুদামাহ, ৩য় খণ্ড, সিয়ামু আশুরা

    [15] আল-মাজমূ শারহুল মুহাযযাব, ষষ্ঠ খণ্ড,  সওমু য়াওমি আরাফা

    [16] আল-ফাতাওয়াল কুবরা, ৫ম খণ্ড

    [17] আল-মওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড ১৩, গুরুর

    [18] আল-মওসুআ আল-ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড ২৮, সওমুত তাতাব্বু‘

    [19] আল-মাদখাল, ১ম খণ্ড,  য়াওমু ‘আশুরা

    লেখক : মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ. অনুবাদ: ইকবাল হোছাইন মাছুম. সম্পাদনা: আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া. উত্স: ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ 23 / 1 / 1431 , 9/1/2010   নির্বাচিত ক্যটাগরী মুহাররাম ও আশূরা